বুদ্ধিমত্তার প্যারাডক্স: সমাজ কেন বুদ্ধিমানদের অপছন্দ করে?
এমন কি হতে পারে, যে মানুষ আসলে বুদ্ধিমানদের নেতিবাচকভাবে দেখে? যদি তাই হয়, তাহলে আমরা এই নেতিবাচক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবো কীভাবে?
সমাজদর্শন
১ মার্চ, ২০২৫
আমরা সবাই বুদ্ধিমত্তাকে সমীহ করি, এটা আমাদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত এবং আরাধ্য একটা গুণ! পুরো পৃথিবী বুদ্ধিমত্ত্বাকে পরিমাপ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, আর যুগে যুগে বুদ্ধিমানদের পুরস্কৃতও করেছে! বুদ্ধিমান মানুষেরাই আমাদের মানবসভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।
বুদ্ধিমান মানুষেরাই যুগান্তকারী সব আবিষ্কার করেছেন, মনোমুগ্ধকর সাহিত্য রচনা করেছেন, সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো তত্ত্ব উপহার দিয়েছেন আমাদের। বুদ্ধিমত্তাকেই আমরা সামনে এগোবার অন্যতম চালিকাশক্তি মনে করি।
তবে... আসলেই কি তাই?
নাকি সত্য আসলে উল্টোটা? এমন কি হতে পারে, যে মানুষ আসলে বুদ্ধিমানদের নেতিবাচকভাবে দেখে? আর যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা এই নেতিবাচক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবো কীভাবে? চলুন, দেখা যাক। আমাদের আজকের টপিক, অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজম বা বুদ্ধিজীবিতা-বিরুদ্ধবাদ।
বুদ্ধিমত্তার প্রতি মুগ্ধতা বনাম হিংসা
বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ে মানুষের মুগ্ধতা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায় –
বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের আইডল হিসেবে গ্রহণ,
তাঁদের অসাধারণ কাজকে সম্মাননা দেওয়া (যেমন, নোবেল পুরস্কার)
আমেরিকায় একটি জরিপে দেখা যায়, অন্য যে কোন পেশার চেয়ে বিজ্ঞানীদের মানুষ বেশি বিশ্বাস করে। ৮৩% মানুষ বিজ্ঞানীদের কাজের প্রতি আস্থা রাখে। (Pew Research Center, 2017).
কিন্তু, এতো কিছুর পরেও, বুদ্ধিমত্তা কোন কোন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে! কাউকে বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে সফল হতে দেখলে আমাদের মনে হিংসা এবং বিরক্তিও তৈরি হতে পারে! এটা মানুষ হিসেবে আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ
শপেনহাওয়ার
আর্থার শপেনহাওয়ার ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক। তাকে বলা হয় নৈরাশ্যবাদী দার্শনিক, কারণ তার বিশ্বদর্শন ছিলো পেসিমিস্টিক। এই পেসিমিস্টিক বিশ্বদর্শন জিনিসটা একটু ছোট করে ব্যাখ্যা করে নেই। আগেই বলে নিচ্ছি আমি খুব সিমপ্লিফাই করবো।
এটা হচ্ছে এমন একটা বিশ্বদর্শন, যেখানে ধারণা করা হয় সবকিছুই সাধারণত খারাপের দিকে যাবে বা সবকিছুর ফলাফল খারাপ হবার সম্ভাবনাই বেশি। এই দর্শন যারা ধারণ করেন, তারা সাধারণত সবকিছুর নেতিবাচক দিকগুলোতে ফোকাস করেন, ইতিবাচক কোনকিছু ঘটলে সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখেন, ব্যর্থতা বা হতাশাকেই স্বাভাবিক ধরে নেন।
আর্থার শপেনহাওয়ার বলেছিলেন সমাজ বুদ্ধিমান মানুষদের পছন্দ করে না। কেউ যখন একজনের সাথে কথা বলতে বলতে বুঝতে পারে যে লোকটা তার চেয়েও বুদ্ধিমান বা সফল, তখন তার মনে লোকটা সম্পর্কে হিংসা জন্ম নেয়, মনে করে যে লোকটা এই বুদ্ধিমত্তা বা সফলতার যোগ্য না। সে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে এবং দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করতে চায়।

নিটশা
১৯ শতকের শেষের দিকে আরেক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিটশা হার্ড মেন্টালিটির (Herd Mentality) সমালোচনা করেছেন। এই হার্ড মেন্টালিটি কি? এটা হচ্ছে মানুষের কোন দলের বা গোষ্ঠীর অংশ হবার আকাঙ্ক্ষা বা ব্যক্তির চেয়ে দলকে গুরুত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা। তিনি বলেন, যারা একটু আলাদা, সমাজ তাদের বিরোধিতা করে, এবং তাকে নিজেদের স্তরে নামিয়ে আনতে চায়। তারা ব্যক্তিচিন্তা এবং মৌলিকতাকে দমিয়ে রাখতে চায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যারা সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস বা আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে, সমাজ তাদের ভয় করে।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন বুদ্ধিমত্তার প্রতি আমাদের এই অস্বস্তির ভিত্তি অনেক গভীরে। সভ্যতার একেবারেই শুরুর দিকে মানুষ যখন ছোট ছোট গ্রুপে দলবদ্ধভাবে বাস করা শুরু করলো, তখন বেঁচে থাকার জন্য সহযোগিতা এবং সামঞ্জস্যতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কিন্তু কেউ যখন তাদের থেকে একটু আলাদা হতো, বিশেষ করে বুদ্ধিমত্তায়, তখন সবাই তাকে দলের জন্য হুমকিস্বরূপ দেখতো।
"তুমি উত্তম তাই বলিয়া আমি অধম হইবো না কেন?"
গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ বুদ্ধিমত্তায় তাদের সমকক্ষদেরকে বেশি বিশ্বাস করে, সহযোগিতা করে। (Balliet & De Dreu, 2014)
সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব অনুসারে, মানুষ নিজেদের এবং অন্যদেরকে বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থার মতো ভাগ করা বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর ভিত্তি করে দলে ভাগ করে। মানুষ তাদের "ইন-গ্রুপ" (নিজের মতো মনে হওয়া লোকজন)-এর প্রতি আনুগত্য দেখায় এবং "আউট-গ্রুপ"-এর প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে। (Tajfel & Turner, 1979)।
যারা একটু আলাদা, তাদেরকে অবিশ্বাস করার এই সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের সমাজে আজকেও টিকে আছে। যাদেরকে সমাজের দশজন "বেশি বুদ্ধিমান", "নার্ডস", বা "আঁতেল" হিসেবে দেখে, তাদের বিভিন্ন সোশ্যাল সার্কেল থেকে আলাদা করার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের সাথে বৈষম্য করার উদাহরণও সমাজে অনেক! আপনার চারপাশেই তাকান! আপনার যে বন্ধুটি আড্ডা দিতে চায় না, সবসময় বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে, তাকে কি কখনো আঁতেল বলে ঠাট্টা করেননি?
মেনসা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংগঠন আছে। এটা হচ্ছে বিশ্বের হাই আইকিউ বিশিষ্ট মানুষদের একটি সংগঠন। প্রায় দেড় লাখ সদস্য আছে তাদের।
২০১৪ সালের একটি জরিপে তারা দেখে সদস্যদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে ৬১ জনই তাদের স্কুল জীবনের কোন না কোন সময় বুলিং এর শিকার হয়েছে।
সক্রেটিস, কপার্নিকাস ও গ্যালিলিও
বুদ্ধিজীবিতার বিরুদ্ধবাদ ইতিহাসে বার বার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেছে, তাঁর বিরুদ্ধেই সমাজের মানুষ একজোট হয়ে নেমে পড়েছে।
এর উদাহরণ ভুরি ভুরি!
যেমন সক্রেটিসের কথাই ধরা যাক। তিনি সবকিছুকে প্রশ্ন করতেন, ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিংকে উদ্বুদ্ধ করতেন, প্রতিষ্ঠিত ধ্যান ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতেন। এজন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। তাঁর অপরাধ? তিনি তরুণদের চিন্তা করতে শিখিয়ে "নষ্ট" করে দিচ্ছিলেন!

রেনেসাঁর যুগে পোল্যান্ডে যখন কপার্নিকাস বলেন যে সুর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘোরে, তখন সে সময়ের চার্চ তাঁর সকল কাজ নিষিদ্ধ করে দেয় এবং তৎকালীন সমাজ তাঁর ঘোর বিরোধিতা করে। কারণ ছিলো, কপার্নিকাসের তত্ত্ব তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ ছিলো না।
কপার্নিকাসের প্রায় ১০০ বছর পর, ইতালিতে গ্যালিলিও যখন সেই একই সুর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দেন, যেখানে তিনি বলেন যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে নয়, সুর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ ঘোরে, তখন তাকেও রোমান ক্যাথলিকরা তাঁর মতামত ভুল বলে স্বীকার করতে চাপ দেন। বাকী জীবনটা গ্যালিলিও গৃহবন্দী হয়ে কাটান।
অথচ এখন কিন্তু সুর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত সত্য। আর ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিংকেও এখন মানুষের খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি গুণ ধরা হয়। ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং এর প্রসার ঘটানোর জন্য উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থাও সেভাবে ডিজাইন করা হয়।
ইতিহাসে এরকম অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে বুদ্ধিমান মানুষদের সমাজ পুরস্কৃত করার বদলে তিরস্কৃত করেছে, শাস্তি দিয়েছে, এমনকি হত্যাও করেছে!

আমরা বুদ্ধিমত্তার ফলে পাওয়া ভালো জিনিসগুলোর প্রতি যেমন আকর্ষণ বোধ করি, তেমনি বুদ্ধিমত্তার ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোকে ভয় পাই। বুদ্ধিমানরা আমাদের ইগোর ওপর, সামাজিক কাঠামোর ওপর, বা প্রতিষ্ঠিত ধারণার ওপর অনেকসময় আঘাত করেন, সেটাকে আমরা ভয় পাই।
এটা একটা প্যারাডক্স।
কিন্তু, এই প্যারাডক্স থেকে আমরা বের হবো কীভাবে?
চিন্তার বৈচিত্র্য হচ্ছে অগ্রগতির অন্যতম চালিকা শক্তি। প্রথমত, আমাদের নিজের মনকে সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে। আমি যেটা জানি বা বিশ্বাস করি, সেটা যে ভুলও হতে পারে, এই সত্যটাকে মেনে নিতে হবে। আপনি যেটা জানেন, সেটার পক্ষে হয়তো ভুরি ভুরি যুক্তি আছে, প্রমাণ আছে, কিন্তু তারপরেও কেউ যখন নতুন এবং পাগলাটে একটা আইডিয়া নিয়ে হাজির হবে, তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে প্রমাণ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রমাণ করতে না পারলে তাঁর বক্তব্য আপনার গ্রহণ করার কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু সুযোগটা অন্তত দেওয়া উচিৎ নয় কি?
আমাদের এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা হয়, মূল্যায়ন করা হয়। আপনি যদি সামাজিক স্তরের একটা উচ্চ অবস্থানেও থাকেন, আপনার নিচে অবস্থিত কেউ কোন মতামত দিলে সেটাকেও শ্রদ্ধা করুন। তা নাহলে আপনি একটা ইকো চেম্বারে ঢুকে যাবেন, যেখানে সবাই শুধু জ্বী স্যার, জ্বী স্যার করে আপনাকে ভুল পথে যেতে দেখলেও বাঁধা দেবে না। আর এর ফলে যে ব্যর্থতা আসবে, সেটার দায় কিন্তু নেতা হিসেবে আপনারই বেশি থাকবে!
সাইকোলজিতে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে বা বুদ্ধিমান হয়ে ওঠাকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। একটা হচ্ছে ন্যাচার, অন্যটা নার্চার। বুদ্ধিমত্তা আর প্রতিভা এক জিনিস নয়। প্রতিভা, বা ট্যালেন্ট বলে আদৌ কিছু আছে কি না সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। হাই আইকিউ আর সফলতার সম্পর্কও প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি এখনও। সেটা নিয়ে অন্যদিন কথা বলা যাবে।
অন্যদের বুদ্ধিমত্তা দেখে আমরা অস্বস্তিতে না ভুগে সেটাকে যদি শেখার সুযোগ হিসেবে দেখি, বুদ্ধিমানদের শিক্ষক হিসেবে দেখি, তাহলে আমাদের নিজেদের বুদ্ধি ও জ্ঞানকে বিকশিত হবার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।