মব জাস্টিসের মনোবিজ্ঞানঃ কীভাবে মব জাস্টিস বন্ধ করা যায়?
শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেই কী এধরণের অপরাধ কমবে নাকি আমাদের আরও গভীরে গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিৎ?
সমাজদর্শন
২০ সেপ, ২০২৪
মব জাস্টিস
যখন একদল মানুষ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে না গিয়ে নিজেরাই কাউকে শাস্তি দেয়, তখন সেটাকে মব জাস্টিস বলে। এটাকে স্ট্রীট জাস্টিস বা রাস্তার বিচার নামেও ডাকা হয়। এটা যে ভালো কিছু নয় সেই আলোচনায় বোধ করি যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহে একজনকে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই এধরণের কোন না কোন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসছে, যদিও এমন ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। নিকট অতীতে মব জাস্টিসের অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনা ছিলো ২০১৯ সালের ২০শে জুলাই ঢাকার বাড্ডায় একটি স্কুলে সন্তানের ভর্তির ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এসে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া তাসলিমা বেগম রেণুর ঘটনা।
কিন্তু এই নির্মম ঘটনাগুলো কেন হয়?
যখন এসব ঘটনা ঘটে, তখন ভুক্তভোগীদের সাহায্যে মানুষ সাধারণত এগিয়ে আসেনা কেন?
যারা এধরণের সহিংসতায় অংশ নেয়, তারা কী আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ মানুষ নাকি অন্য কিছুর প্রভাবে তারা সহিংস হয়ে ওঠেন?
শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেই কী এধরণের অপরাধ কমবে নাকি আমাদের আরও গভীরে গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিৎ?
মব জাস্টিস-এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে এবং মবের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গেলে মনোবিজ্ঞানের দুইটি তত্ত্ব আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১. বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট বা নীরব দর্শক নীতি
যখন একাধিক মানুষ কোন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকে তখন কারও বিপদ দেখলে তারা মনে করে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে, তাই আর নিজে গিয়ে ভিক্টিমকে সাহায্য করেন না। সমস্যা হচ্ছে, উপস্থিত সবাই যখন এভাবেই ভাবতে থাকেন, তখন আসলে কেউ আর সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন না। এটা "ডিফিউশন অব রেসপনসিবিলিটি" বা "দায়িত্ব হ্রাসের প্রবণতা" হিসেবেও পরিচিত।
১৯৬৮ সালে মনোবিজ্ঞানী জন ডার্লি এবং বিব লাটানে জানার চেষ্টা করেন কোন ঘটনাস্থলে অন্য কারও উপস্থিতি একজন মানুষের সাহায্য করার সম্ভাবনা এবং গতির ওপর কোন প্রভাব ফেলে কী না। তারা পরীক্ষা করে দেখতে পান কোন ঘটনাস্থলে মানুষের উপস্থিতি যতো বেশি থাকে, সাহায্য করার হার ততো হ্রাস পেতে থাকে। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা যতো বেশি হবে, ততো কম মানুষ সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

এবার ঢাবি এবং জাবির ঘটনা দুটো যদি দেখি, ঘটনাস্থলে কী এমন কেউ উপস্থিত ছিলেন না যিনি এই ঘৃণ্য কাজগুলোকে সমর্থন করেন না? হয়তো ছিলেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। বাইস্ট্যান্ডার হিসেবে শুধু দেখেছেন এবং অন্য কারও এগিয়ে আসার অপেক্ষায় থেকেছেন। তাহলে এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
বাইস্ট্যান্ডার ইন্টারভিনশন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের পরামর্শ হচ্ছে এই জিনিসটি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অন্যদের অপেক্ষায় না থেকে নিজে থেকেই এগিয়ে আসা। এ ধরণের মব জাস্টিস থেকে ভিক্টিমকে রক্ষা করতে বেশিরভাগ সময় শুধু একজনের এগিয়ে আসা দরকার। বাইস্ট্যান্ডার হিসেবে না থেকে শুধু একজন যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে তার দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে আসবেন।
বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট নিয়ে আমি একটি ভিডিও বানিয়েছিলাম। সেটাও দেখে ফেলতে পারেন!
২. ডিইন্ডিভিজুয়েশন বা স্বাতন্ত্র্যবোধের বিলোপ
মানুষ যখন একটা গ্রুপের সাথে থাকে, তখন সে নিজের স্বাতন্ত্র্যবোধ হারিয়ে ফেলে। তার নিজের যে আত্মসচেতনতা এবং ব্যক্তিগত পরিচয় আছে, সেটি লোপ পায় এবং গ্রুপের কেউ কিছু করলে সেটা অনুকরণ করতে থাকে। আর এই আচরণই প্রকাশ হতে পারে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তে, বিচ্যুতিতে, এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে। অথচ একা থাকলে হয়তো মানুষ সেই কাজগুলো করতো না।
ঢাবির ঘটনাটিতে আটক হওয়া একজন ছাত্র ধরা পড়ার পর বলেছেন তিনি "আবেগে মেরেছেন।" তার একটি মোবাইল চুরি হয়েছিলো, তাই স্বাভাবিকভাবেই "চোরের" প্রতি তার পুষে রাখা একটা ক্ষোভ ছিলো। কিন্তু এই আবেগ জ্বালানি পেয়েছে কোথায়? তিনি যে গ্রুপে ছিলেন, সেই গ্রুপ থেকেই। তার স্বাতন্ত্র্যবোধের বিলোপ ঘটেছিলো। গ্রুপের সাথে না থাকলে ভিন্ন পরিবেশে হয়তো তিনিও এই কাজটি করতেন না।
ফরাসী পলিম্যাথ গুস্তাভে বন তাঁর ১৮৯৫ সালের Crowd: A Study of the Popular Mind বইতে বলেন, যখন একজন মানুষ ভিড়ের মধ্যে থাকে, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয় এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ লোপ পায়। এর ফলে সে প্রায়ই অযৌক্তিক, আবেগী, এবং কখনো কখনো সহিংস কাজ করে ফেলে। কারণ সে তখন ভিড়ের "সমষ্টিগত মনের" (Collective Mind) অংশ হয়ে যায়!
এছাড়াও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বার্ডো তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণা "স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট"-এর মাধ্যমে দেখান কীভাবে সাধারণ মানুষ অজ্ঞাত হবার সুযোগ পেলে এবং অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব পেলে নিষ্ঠুর এবং অমানবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন। (জিম্বার্ডো, ১৯৬৯)

তাহলে আমরাও কী সেরকম কোন পরিস্থিতিতে পড়লে সহিংস হয়ে উঠতে পারি? সচেতন না থাকলেও আসলে আমরাও এধরণের বর্বরতায় অংশগ্রহণ করে ফেলতে পারি! যখনই আমরা কোন গ্রুপের সাথে থাকবো, আমাদের সবসময় নিজেদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমাদের স্বতন্ত্র একটি মন আছে, আমাদের নিজস্ব কিছু নীতিবোধ এবং আদর্শ আছে। বাইরের অনেক কিছু আমাদের প্রভাবিত করলেও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারি। যখনই কোন ভিড়ের মধ্যে অন্যদের কিছু করতে দেখবো, সেটাতে যোগ দেওয়ার আগে আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, এই কাজটা কী আমি থাকলে করতাম? আমার আদর্শ ও মূল্যবোধ কি এই কাজটিকে সমর্থন করে? উত্তর "না" হলে আমাদের সেটি থেকে বিরত থাকতে হবে।
মব জাস্টিস প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব
সাম্প্রতিক মব জাস্টিসগুলোর বিচার হয়তো একসময় হবে, অপরাধীরা শাস্তি পাবে এই প্রত্যাশাও আমরা করি। তবে, শুধু অপরাধীকে শাস্তি দিলেই অপরাধ সমাজ থেকে কমে যায় না, অপরাধের উৎস অনুসন্ধান করে একেবারে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে হয়ে ।
সমাজে অপরাধ কমানোর জন্য অপরাধবিজ্ঞানীরা বহুমুখী উদ্যোগের কথা বলেন। যার মধ্যে আর্থসামাজিক বৈষম্য মোকাবেলা করা, কমিউনিটি পুলিশিং, নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ ডিজাইন, সংগঠিত অপরাধ ও দুর্নীতি টার্গেট করা, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করাসহ অনেক কিছুই আছে। তবে আমি শুধু ৩টি সামাজিক গুরুত্বপুর্ণ দিকে সংক্ষেপে দৃষ্টিপাত করবো, কারণ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা বেশি এবং ব্যক্তিগতভাবে সেগুলোর ওপর কিছুটা হলেও আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।
১. শিশু অবস্থায় প্রাথমিক হস্তক্ষেপ
প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক ও দার্শনিক হিপোক্রেটিস থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক মনোবিজ্ঞানও এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে না যে প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিত্বে, চরিত্রে, আদর্শে, বিশ্বাসে, এবং কর্মে তার পরিবেশের প্রভাব খুব গুরুত্বপুর্ণ। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক উইলিয়াম জেমস, জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স, ইংরেজ দার্শনিক জন লক-সহ অনেক চিন্তাবিদই মনে করতেন "মানুষ তার পরিবেশের প্রোডাক্ট।" অর্থাৎ –
একজন মানুষ যে পরিবেশে বড় হবে, যে ধরণের পরিবার, বন্ধু, শিক্ষা, সুযোগ পাবে; সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। তার চিন্তা-চেতনা-আদর্শ সেভাবেই গড়ে উঠবে। সে ক্রিমিনাল হবে নাকি ভালো মানুষ হবে সেটাও অনেকটা নির্ধারিত হবে তার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে মুখোমুখি হওয়া পরিবেশের প্রভাবে।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস উইলসন এবং মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড হার্নস্টাইন তাদের "ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ন্যাচার" (১৯৮৫) বইয়ে বলেন – একটা শিশুর জীবনের প্রারম্ভিক অভিজ্ঞতা তার ক্রিমিনাল আচরণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যখন একটা শিশুর সামনে কোন ইতিবাচক রোল মডেল থাকে না, তাকে ন্যায়-অন্যায় শেখানোর কেউ থাকে না, তখন সে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। এজন্য তারা আর্লি ইন্টারভিনশন বা প্রাথমিক হস্তক্ষেপের পরামর্শ দেন।

প্রখ্যাত ব্রিটিশ অপরাধবিজ্ঞানী ডেভিড ফারিংটনও বলেন যে শিশুদের অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে প্রাথমিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে কার্যকর উয়াপায়গুলোর একটি। শিশু অপরাধীদের গুরুতর, সহিংস, এবং দীর্ঘস্থায়ী অপরাধী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দুই থেকে তিনগুণ বেশি। (লোবার ও অন্যান্য, ২০০৩)
যদি আপনার পরিবারের বা পরিচিত কোন শিশুর অপরাধপ্রবণ আচরণ দেখেন, তাহলে তখনই তাকে সুন্দর করে বোঝাতে হবে যে তার সেই আচরণটি সঠিক নয় এবং কোন আচরণটি করা উচিৎ ছিলো।
২. অপরাধীর পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য
মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত বিশ্বে এখন ব্যাপক গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। এ সংক্রান্ত গবেষণা এবং সচেতনতা এখন আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টি এখনো সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর আর্থ-সামাজিক কারণও অবশ্য আছে, সমাজে মানুষের চাহিদা এবং প্রয়োজনের ধরণ নির্ভর করে সেই সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। তবে অপরাধীদের আবারও অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া খুব গুরুত্বপুর্ন।
অস্ট্রেলিয়ান অপরাধবিজ্ঞানী জন ব্রেথওয়েট ১৯৮৯ সালে রিইনটিগ্রেটিভ শেইমিং নামে একটি তত্ত্ব দেন। সহজ ভাষায় এর মূল ধারণাটি হচ্ছে – একজন মানুষ যখন অপরাধ করে ফেলে তখন সমাজের উচিৎ তাকে কৃতকর্মের জন্য লজ্জ্বা দেওয়া এবং অপরাধী বোধ করানো, তবে চিরদিনের জন্য তাকে একজন খারাপ মানুষ হিসেবে গণ্য করা নয়। ধরা যাক, একজন কিশোর চুরি করে বসলো। তখন সমাজের উচিৎ হবে তাকে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ানো এবং ভুল শোধরাতে বলা। এবং তারপরে তাকে সারাজীবনের জন্য একজন অপরাধী হিসেবে গণ্য না করে সমাজের একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করা।
ব্রেথওয়েট যুক্তি দেন যে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার উচিত অপরাধীদেরকে কলঙ্কিত হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে তাদের সমাজে আবারও একীভূত করে পুনর্বাসনের দিকে মনোনিবেশ করা। কারণ মানুষকে সমাজে কলঙ্কিত হিসেবে চিহ্নিত করে ফেললে, বিশেষ করে তারা যদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন, তারা আরও একাকীত্বে ভোগেন এবং আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডরোথি লুয়িস মানুষের সহিংস আচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট মানসিক এবং স্নায়বিক কারণগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন। লুইস এর মতে, সহিংস অপরাধ হ্রাস করার জন্য অপরাধী এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা – উভয়কেই কাউন্সেলিং এবং থেরাপি সহ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা অপরিহার্য।
৩. পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা
আমরা একটু আগেই আলোচনা করেছি একজন শিশু সমাজের একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য তার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবেশের প্রভাব কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, নগরায়ন, প্রযুক্তির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের সামাজিক কাঠামো দিনদিন দূর্বল হয়ে পড়ছে। যদিও সমস্যাটি শুধু আমাদের দেশেই হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়, সমস্যাটি সার্বজনীন।
মার্কিন সমাজ বিজ্ঞানী ট্রাভিস হিরশি ১৯৬৯ সালে তার সোশ্যাল বন্ড তত্ত্বে বলেন – একজন মানুষ যদি শক্ত সামাজিক বন্ধনের মধ্যে থাকে, বিশেষ করে নিজের পরিবারের মধ্যে, তাহলে তার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। হিরশি একজন মানুষের অপরাধ প্রবণতার চারটি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান চিহ্নিত করেন – তার সামাজিক সংযুক্তি বা বন্ধন, প্রতিশ্রুতি, সম্পৃক্ততা, এবং বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এবং সমাজের মানুষদের সাথে সম্পৃক্ততা এমন কিছু সামাজিক নিয়ম (নর্ম) তৈরি করে যা তাকে অপরাধে জড়াতে বাঁধা দেয়। অর্থাৎ, পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন যদি দৃঢ় হয়, তাহলে মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
শিশুদের বেলায় প্রাথমিক হস্তক্ষেপ, অপরাধীর পূনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা, এবং পারিবারিক এবং সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে আমরা যার যার অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারি। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। সেইসাথে মব জাস্টিস প্রতিরোধে এবং সেগুলোতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে আমরা দুটি কাজ এখন থেকেই শুরু করতে পারি।
যখন কোথাও কারও বিপদ দেখবেন, অন্যদের আশায় না থেকে আপনি নিজে এগিয়ে যান। একা সাহস না পেলে আশেপাশের দুয়েকজনকে দ্রুত রাজি করিয়ে হলেও এগিয়ে যান। বাইস্ট্যান্ডার হিসেবে থাকবেন না।
যখনি কোন গ্রুপের সাথে থাকবেন, নিজের স্বাতন্ত্র্যবোধকে বিলুপ্ত হতে দেবেন না। গ্রুপ যা করছে তাই অনুকরণ করার আগে একবার চিন্তা করুন যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আপনি ঐ কাজটি করতেন কি না। এটা কঠিন, তবে অসম্ভব না।