ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, রিকার্শন বা পুনরাবৃত্তি, এবং পিরাহাঁ গোত্র
আজকের এই ভাষা দিবসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে এমাজন জঙ্গলের পিরাহাঁ গোত্রের ভাষা নিয়ে একটা ছোট ডকুমেন্টারি দেখলাম। কি শিখলাম?
সমাজদর্শন
২১ ফেব, ২০২৫
বিখ্যাত ভাষাবিদ ও দার্শনিক নম চমস্কি দাবি করেন যে রিকার্শন বা পুনরাবৃত্তি হলো ভাষার একটা সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, রিকার্শন আমাদের মস্তিষ্কে অন্তর্নিহিত (Innate) এবং এটি মানুষের ভাষাকে অন্যান্য প্রাণীর যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে। তার মতে, মানুষের ভাষার মূল কাঠামো বা “ইউনিভার্সাল গ্রামার” এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রিকার্শন।

রিকার্শন আসলে কী?
রিকার্শন এমন একটি ভাষাগত বা গাণিতিক ধারণা যেখানে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা নিয়ম নিজেই তার মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
ভাষার ক্ষেত্রে, এটি এমন এক বৈশিষ্ট্য যা আমাদের বাক্য গঠনের সীমাহীন ক্ষমতা দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় —
“আমি জানি [যে তুমি জানো [যে সে জানে]]”
এখানে, একটি বাক্যের মধ্যে আরেকটি বাক্য ঢুকে মূল বক্তব্যটাকে একাধিক বাক্য হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। এই ধরনের কাঠামোর কারণেই আমরা অসংখ্য জটিল বাক্য তৈরি করতে পারি।
রিকার্শন না থাকলে কী হতো?
এই কথাটাকে হয়তো আমরা এভাবে বলতাম –
“আমি জানি। তুমি জানো। সে জানে। আমি এটাও জানি যে তুমি জানো। তুমি এটাও জানো যে সে জানে। আমি এটাও জানি যে সে জানে।”
হয়তো ঠিক হয়নাই, তবে আপনি একটা ধারণা পেয়েছেন। রিকার্শন না থাকলে আমাদের বাক্য গঠন হতো সরল ও ছোট ছোট। যেটা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করাকে যেমন সীমিত করতো, তেমনি আমাদের চিন্তাকেও।
নৃবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল এভারেট এক খ্রিস্টান মিশনে গিয়েছিলেন এমাজনের জঙ্গলে। সেখানে গিয়ে তিনি পরিচিত হন পিরাহাঁ (Pirahã) নামের এক জনগোষ্টির সাথে। এভারেট আবিষ্কার করেন তাদের ভাষায় কোন রিকার্শন নেই! এজন্য তাদের বাক্য গঠন খুব সরল, এবং ছোট ছোট।
যেমন, ডকুমেন্টারির মধ্যেই একজন পিরাহাঁ বলছিলেন যা বলছিলেন, তার বাংলা করলে অনেকটা এরকম হয় —
বউ বলে বড় মাছ। বউ ক্ষুধার্ত। বড় মাছ নাই। বউ রাগ।
আসলে সে বলতে চেয়েছে —
বউ বলেছে সে ক্ষুধার্ত, বড় মাছ ধরে আনতে। বড় মাছ পাইনি, বউ রাগ করবে।

যদিও এভারেট এর এই আবিষ্কার নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। স্বয়ং চমস্কি তাকে শার্লাটান (Charlatan) বলেছেন। শার্লাটান এর মানে হচ্ছে “প্রতারক বা ভণ্ড ব্যক্তি যে নিজেকে বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ বলে দাবি করে, কিন্তু সে আসলে তা নয়।”
এভারেটের দাবি সত্য হলে চমস্কির দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়! অর্থাৎ “পুনরাবৃত্তি” যে ভাষার একটি সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য, সেই দাবিটা আর টেকে না।
যতটুকু জেনেছি, এমআইটি একটা গবেষক দল পাঠাবে যাচাই করার জন্য। তারা রিকার্শন সনাক্ত করার জন্য একটা সফটওয়্যারও বানিয়েছে সেই বিশেষ কাজে।
পিরাহাঁ গোত্রের আরেকটা মজার তথ্য হচ্ছে তারা গুনতে পারে না। এভারেট তাদের ৮ মাস ধরে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা শেখানোর চেষ্টা করেছেন, ১+১ = ২ শেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এগুলো নিয়ে তারা খুব তাড়াতাড়ি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কারণ এগুলো নাকি তাদের কাছে খুব জটিল মনে হয়!
আমরা সমৃদ্ধ একটা ভাষা পেয়েছি। আর এর ফলেই আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি হয়েছে সমৃদ্ধ।
এই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতেই রক্ত দিয়েছেন ভাষা শহীদেরা। সেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।