সত্য, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, এবং সরলীকরণ
পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই জটিল। অথচ আমরা সেগুলোরও সরলীকরণ করে ফেলি। কেন করি?
সমাজদর্শন
৮ সেপ, ২০২৪
জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং সরলীকরণের প্রবণতা
পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই জটিল। অথচ আমরা সেগুলোরও সরলীকরণ করে ফেলি। কেন করি? কারণ আমরা কম জানি, কম বুঝি, কম বিশ্লেষণ করি অথবা একেবারেই করি না। আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। আমরা এক বিষয়ে কিছুটা বেশি জানি, অন্য বিষয়ে অল্প জানি, কিছু বিষয়ে একেবারেই জানি না।
জ্ঞানার্জনের জার্নি এবং সক্রেটিক প্যারাডক্স
আমরা যতো বেশি শিখতে ও জানতে থাকি, ততো বেশি আবিষ্কার করতে থাকি যে পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডার কতো বিশাল আর আমাদের জ্ঞান কতো ক্ষুদ্র! গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস এজন্য বলতেন—
আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না।
এটাকে বলা হয় সক্রেটিক প্যারাডক্স।
ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট: জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাসের সম্পর্ক
ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট এর বক্তব্য হচ্ছে আমরা যতটুকু জানি, তার চেয়েও বেশি জানি বলে মনে করি। নিজেকে ওভারএস্টিমেট করি। মানুষের জ্ঞানার্জনের একটা জার্নি আছে। যখন মানুষ কম জানে, তখন তার আত্মবিশ্বাস খুব বেশি থাকে। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। অন্য সবাইকে স্টুপিড মনে করে। আরেকটু জানার পরে তার বড় একটা ধাক্কা লাগে। মনে হয় সে আসলে তেমন কিছুই জানে না। তারপর জ্ঞানার্জন করতে করতে সে এমন একটা পর্যায়ে যায়, যেখানে তার জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাসের মধ্যে একটা ব্যালান্স আসে।

নুয়ান্স: সামান্য পার্থক্যের গুরুত্ব
ইংরেজিতে Nuance বলে একটি শব্দ আছে। এর বাংলা অর্থ সামান্য পার্থক্য বা অতি সূক্ষ্ম তারতম্য। তবে আমার মনে হয় বাংলায় আমরা এই শব্দটার প্রতি সুবিচার করতে পারি না। একটু সহজভাবে শব্দটা বোঝার চেষ্টা করি।
ধরুন, আপনার কাছে এক সেট রং পেন্সিল আছে। এর মধ্যে একেকটা একেক কালারের। ওখানে আকাশী রঙ এবং গাঢ় নীল রঙয়ের পেন্সিল আছে। কিন্তু আকাশী রঙ আর গাঢ় নীল রঙের মধ্যে যে নীল রঙয়ের আরও বিভিন্ন শেইডস আছে, সেগুলোই হছে নুয়ান্সেস।

ঘটনার নুয়ান্সেস এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
এখন, আমরা প্রতিদিন যেসব ঘটনা দেখি বা শুনি, সেগুলোরও নুয়ান্সেস থাকে। কিন্তু আমরা সেগুলো সাধারণত জানতে পারি না, বা জানার চেষ্টা করি না। কেউ ঘটনাগুলোকে আকাশী রঙ হিসেবে দেখি, কেউবা গাঢ় নীল রঙ হিসেবে। কেউ কেউ আবার একেবারেই অন্য রঙয়ে!
এনালাইসিস প্যারালাইসিস: অতিরিক্ত বিশ্লেষণের সমস্যা
এনালাইসিস প্যারালাইসিস বলে একটা জিনিস আছে। আমরা যখন একটা বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করি এবং অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না। এটা তখনও হয়, যখন আপনি কোন বিষয়ের নুয়ান্সগুলো জানেন এবং বোঝেন। তাই যখনি কিছু দেখেন বা শোনেন, সেটার বিষয়ে সাথে সাথেই একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।
মাজার ভাঙার প্রকল্প
যেমন মাজার ভাঙার ব্যাপারেই আসি। মাজারপুজা সুন্নি মুসলিমদের মতে শিরক, যা জঘন্যতম পাপগুলোর একটি। আবু ত্বহার মাধ্যমে জানতে পরলাম যে আমাদের মহানবী (সাঃ) নিজেই যুদ্ধে বিজয়ী হবার পর মুর্তি ভেঙ্গেছিলেন। এই তথ্যটুকু যে জানে সে মাজার ভাঙবে, ভেঙে মনে করবে খুব ইসলাম করে ফেললাম!
আবার, যিনি নিজেকে খুব প্রগতিশীল ভাবেন, তিনি এই মাজার ভাঙা এবং আবু ত্বহার পোস্ট দেখে মজা পাবেন। তিনি ইসলামকে গালি দেবেন, "শান্তির ধর্মের শিক্ষা" বলে ব্যঙ্গ করবেন। তারপর ভাববেন খুব প্রগতিশীলতা করে ফেললাম!
কিন্তু এই দুজনের একজনও ১৪০০ বছরের আগের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক কি না সেটা সে বিবেচনায় নেয়নি, নুয়ান্সেস দেখেনি।
যে মাজার ভাঙলো সে যদি বুঝতো যে জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে সেটা মানুষ মন থেকে গ্রহণ করে না, তাহলে সে মাজার ভাঙতো না। যাদের মাজার ভাঙলো, তাদের সাথে এবং তাদের সমমনাদের সাথে শত্রুতা তৈরি করলো।
অথচ সে যদি সত্যিই চাইতো মানুষ মাজার পূজা থেকে বেরিয়ে আসুক, তাহলে সে সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতো। সে মাজার পূজা করা কেন ভালো না সেটা বোঝানোর চেষ্টা করতো খুব ভদ্র এবং পরিশীলিত উপায়ে। ভালোবাসা দিয়ে মাজার পূজারির মন জয় করার চেষ্টা করতো।
আপনাকে যে হুমকি দিয়েছে, যে আপনার ওপর হামলা করেছে, আপনি তার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন? করা সম্ভব? আপনি তার আদর্শে কখনো বিশ্বাসী হবেন?
আবার, যেই প্রগতিশীল ভাইটি মাজার ভাঙতে দেখে এই দেশ আমার না, দেশ আফগান হয়ে গেলো বলে খুব রাগ করলেন, তিনিও বোঝার চেষ্টা করেননি যে কিছু লোক কেন মাজার ভাঙতে যায়। অথবা, মানুষ যা করে তা কেন করে? আচ্ছা, প্রগতিশীল ভাইটি কেন মাজার ভাঙতে গেলেন না?
পরিবেশের প্রভাব এবং মানুষের আচরণ
প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক ও দার্শনিক হিপোক্রেটিস থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক মনোবিজ্ঞানও এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে না যে প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিত্বে, চরিত্রে, আদর্শে, বিশ্বাসে তার পরিবেশের প্রভাব খুব গুরুত্বপুর্ণ। অ্যামেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক উইলিয়াম জেমস, জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স, ইংরেজ দার্শনিক জন লক-সহ অনেক চিন্তাবিদই মনে করতেন মানুষ তার পরিবেশের প্রোডাক্ট। অর্থাৎ, একজন মানুষ যে পরিবেশে বড় হবে, যে ধরণের পরিবার, বন্ধু, শিক্ষা, সুযোগ পাবে; সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। তার চিন্তা-চেতনা-আদর্শ সেভাবেই গড়ে উঠবে। সে ক্রিমিনাল হবে নাকি মহামানব হবে সেটাও অনেকটা নির্ধারিত হবে সেই পরিবেশের প্রভাবে।
তাহলে, যে মাজার ভাঙতে গেলো, তাকে আপনি কখনো বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে এটা করা ঠিক হবে না বা এটা করে কোন লাভ হবে না? তাকে যে তার পরিবেশ, তার রাষ্ট্র শিক্ষা দিলো না, এই দায় কী পুরোপুরি তার? আপনি যদি সেই পরিবেশে বড় হতেন, আপনি যে মাজার ভাঙতে যেতেন না সেই গ্যারান্টি দিতে পারেন?
সরলীকরণের সমস্যা এবং সমাধানের পথ
এই যে আমরা সকল ঘটনার এভাবে সরলীকরণ করি, নুয়ান্সেস দেখি না, এটাই হচ্ছে সমাজের সকল দ্বন্দ্বের অন্যতম উৎস। আমরা এই দ্বন্দ্ব থেকে বের হবো কীভাবে?
এজন্য সবার আগে দেশের সকল প্রান্তে সুশিক্ষার অবাধ এক্সেস নিশ্চিত করা দরকার। মাদ্রাসার ছেলেটাকে যেমন শেখানো দরকার জোর করে মন পাওয়া যায় না, তেমনি প্রগতিশীল ভাইটিকেও শেখানো দরকার পরিবেশ কীভাবে মানুষকে তৈরি করে। আমাদের নুয়ান্সেস বুঝতে চেষ্টা করা দরকার। সুশিক্ষার কোন বিকল্প নাই, সুশিক্ষা ছাড়া কোনদিন সমাজে হার্মনি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।
ঘটনার তিন সত্য: আমার সত্য, আপনার সত্য, এবং প্রকৃত সত্য
প্রতিটা ঘটনার অন্তত তিনটা সত্য থাকে — আমার সত্য, আপনার সত্য, এবং প্রকৃত সত্য। আপনি-আমি কেউই হয়তো মিথ্যা বলছি না, তবে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, আমাদের জানা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আলাদাভাবে ঘটনা বিশ্লেষণ করেছি। এইটুকু যদি আপনি জানেন, তাহলে আপনার পক্ষে যেকোন ঘটনাকে ১০০% বুঝেছেন বলে দাবী করা কঠিন হয়ে যায়। তখন আপনি হাম্বল হন, অ্যারোগেন্স কমে যায়।

যেকোন ঘটনা দেখে আমরা সাথে সাথেই রিয়্যাক্ট না করে একটু জানার চেষ্টা করি, বোঝার চেষ্টা করি।
আমরা নিজেকে জিজ্ঞাসা করি -
মানুষ যা করে তা কেন করে?