অন্যরা যেভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে: ফেইসবুক রিয়্যাক্ট থেকে শুরু করে গ্রুপ থিংকিং
অন্যরা আমাদের সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে? গ্রুপ থিঙ্কিং কী?
মনোজগত
২৭ ডিসে, ২০২৩
ফেইসবুক রিয়্যাক্ট: সামাজিক বৈধতার প্রভাব
আপনি ফেইসবুক স্ক্রল করছেন। এমন একটা পোস্ট দেখলেন যেটা আপনার কাছে বেশ মজার মনে হলো এবং আপনি হাহা রিয়্যাক্ট দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দেখলেন অন্যরা লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছে। যার পোস্ট, তার যদি মোটামুটি একটা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা থাকে, বা সেলিব্রিটি টাইপের কেউ হন, অথবা তাকে আপনি সম্মান করেন, অথবা কোনটাই না থাকলেও তিনি আপনার খুব কাছের কেউ নন, তাহলে খুব সম্ভাবনা আছে আপনি আর হাহা রিয়্যাক্ট না দিয়ে লাভ রিয়্যাক্ট দেবেন।
এইযে অন্যদের দেখাদেখি আপনি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন, বা অন্যদের কাজ দ্বারা প্রভাবিত হলেন, এটাকে মনোবিজ্ঞানে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তারই একটা হলো Social Validation বা বাংলায় বললে সামাজিক বৈধতা এর মতো একটা বিষয়।
অন্যরা যেটা করেছে, সেটাই আপনার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে তাই আপনি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। UX ডিজাইনে এটাকে সামাজিক নিদর্শন বা Social Proof হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আপনি হয়তো কোন একটা ইকমার্স সাইটে ঢুকেছেন, সেখানে দেখাচ্ছে "অমুক এইমাত্র এই প্রোডাক্টটি কিনলেন"। এটা দেখে আপনি কিছুটা ভরসা পাবেন। আপনি ভাববেন মানুষ যেহেতু কিনছে, আমিও কিনতে পারি।
মানুষের অজান্তে প্রভাবিত হওয়া
মানুষ মনে করে যে তাকে সহজেই কোনকিছু প্রভাবিত করতে পারে না। প্রায় সবাই মনে করে তারা নিজেরা প্রভাবিত না হলেও অন্যরা সহজেই প্রভাবিত হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ নিজের অজান্তেই তার পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়। এমনকি আপনি যদি কোথাও হেটে যাওয়ার আগে বৃদ্ধ, স্লো, বা পুরনো– এই শব্দগুলোর মতো কিছু পড়েন, তাহলে আপনি যাওয়ার সময় আস্তে আস্তে হেটে যাবেন! আবার তরুণ, উদ্যম, চটপটে– এধরনের শব্দগুলো পড়লে একটু তাড়াতাড়ি হেটে যাবেন (Bargh, 1996)। ভাবা যায়!?
গ্রুপ থিংকিং এবং লিডারের প্রভাব
সাধারণত যে কোন আলোচনায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষ একজন লিডার বের করে ফেলে নিজেদের মধ্যে। এবং সেই লিডার যে মতামত দেয়, সেটাতেই সবাই সহমত প্রকাশ করে এবং মেনে নেয়। আমার ধারণা আলোচিত বিষয় সম্পর্কে "সবার" ভালো জানাশোনা না থাকলে এমনটা হয়; তবে এটা শুধুই আমার ধারণা মাত্র। এই লিডার কীভাবে বের হয়?
গবেষকরা দেখেছেন যিনি প্রথমে কথা বলে উঠেছেন, তিনিই আসলে ঐ আলোচনার অঘোষিত লিডার হয়ে গেছেন। এবং ৯৪% ক্ষেত্রে, প্রথমে যে প্রস্তাব বা সমর্থন দেওয়া হয়েছিলো, সেটাই সবাই মেনে নিয়েছে (Anderson & Kilduff, 2009)।
গ্রুপ থিংকিং এর সমস্যা এবং সমাধান
সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ গ্রুপ থিংক বা "দশের লাঠি একের বোঝা"– চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়। তারা মনে করে সবাই মিলে একটা কাজ করলে সেই কাজটা ভালো হয় বা তারা ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা সবসময় সত্য না। Lean UX প্রসেসের একটা প্রিন্সিপল হচ্ছে– Small, Dedicated, Colocated; অর্থাৎ– ছোট, নিবেদিত, কাছাকাছি। বইটির লেখকদের মতে, একটা প্রোজেক্টের কোলাবরেশন বা মিটিঙয়ের সময় একটা টিমে ১০ জনের বেশি থাকা উচিৎ নয়। বেশি থাকলে কাজের গতি কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়। এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও সত্য মনে হয়, তবে টিমের সবাই যদি নিজের কাজ ও কাজকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে সচেতন থাকেন এবং আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, সম্ভবত তখনই এমন হতে পারে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুস্থ্য আলোচনার গুরুত্ব
এইযে অন্যদের সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রভাবিত হবার ব্যাপারটা, বা লিডার বের করে ফেলার ব্যাপারটা, এটা স্বাস্থ্যকর আলোচনার জন্য ভালো নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিঙয়ের শুরুতে আপনি যদি মিটিঙয়ে অংশগ্রহণ করা সবাইকে অন্যদের মতামত জানিয়ে দেন, তাহলে পুরো মিটিঙয়ে কেউ ভালোভাবে মনোযোগ দেবে না। তাদের সামনে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত ভালোভাবে দেখবে না, পড়বে না, এবং নিজের সুচিন্তিত মতামত দেবে না (Anderson & Kilduff, 2009)। মিটিং এর মাঝখানেই তাদের জিজ্ঞাসা করলে বিষয়টা বুঝতে পারবেন।
তাহলে ভালো পন্থা কোনটা?
ভালো পন্থা হচ্ছে অন্যদের সিদ্ধান্ত বা মতামত শুরুতেই কাউকে না জানানো এবং আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে সবাইকে ভালো ধারণা দেওয়া। সেইসাথে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নাম ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করা। কারণ যে কোন আলোচনায় সবচেয়ে উঁচু গলায় কেউ না কেউ কথা বলবেই, আর কেউ কেউ একটু চুপচাপ মানুষ হবার কারণে কথা বলার সুযোগ পাবে না (Zhuo, 2019)।
ফেইসবুক রিয়্যাক্ট দিয়েই শেষ করি 😀
আপনি হাহাটা দিয়ে দেন, দেখবেন আপনার দেখাদেখি আরও অনেকেই হাহা দেওয়া শুরু করেছে! 😆