এরিস্টটল থেকে গ্যালিলিওঃ আমাদের বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়ার অভ্যাস এবং বায়াস অব অথরিটি

অথরিটির প্রতি আমাদের অন্ধ বিশ্বাস কীভাবে আমাদের ভুল পথে নিয়ে যায়?

মনোজগত

১১ ডিসে, ২০২৪

এরিস্টটল থেকে গ্যালিলিওঃ আমাদের বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়ার অভ্যাস এবং বায়াস অব অথরিটি | খালিদ হাসান জীবন এর ভাবনা | ব্লগ | Khalid Hasan Zibon | Blog
এরিস্টটল থেকে গ্যালিলিওঃ আমাদের বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়ার অভ্যাস এবং বায়াস অব অথরিটি | খালিদ হাসান জীবন এর ভাবনা | ব্লগ | Khalid Hasan Zibon | Blog

এরিস্টটল: প্রাচীন যুগের পলিম্যাথ

এরিস্টটল ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এবং পলিম্যাথ। "পলিম্যাথ" মানে হচ্ছে "বহুবিদ্যাবিশারদ" বা যাদের অনেকগুলো বিষয়ে ভালো জ্ঞান এবং দখল আছে! এরিস্টটলকে বলা হয় "প্রথম প্রকৃত বিজ্ঞানী।" বহু বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য ছিল, এবং অনেকগুলো জ্ঞানের শাখার সূচনা করেছেন তিনি। তিনি আগাগোড়াই একজন জিনিয়াস!

Illustration of Aristotle (এরিস্টটল), Ancient Greek Philosopher, Student of Plato | গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের ছবি চিত্র, তিনি ছিলেন প্লেটোর ছাত্র এবং অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট এর শিক্ষক


এরিস্টটল কতোটা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ছিলেন?

তার শিক্ষক ছিলেন আরেক বিখ্যাত দার্শনিক, প্লেটো। আর প্লেটোর শিক্ষক ছিলেন সক্রেটিস, যাকে বলা হয় তার সময়ে গ্রিসের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ! এরিস্টটলের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন "প্রায় বিশ্ব জয় করে ফেলা" সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর শিক্ষক! মধ্যযুগের মুসলিমরা তাকে বলতেন "The First Teacher," আর ইতালীয় কবি দান্তে তাকে বলেছেন –

The master of those who know!


গ্রীসের দ্য একাডিমিতে সক্রেটিস এবং প্লেটোর ভাস্কর্য | Status of Socrates and Plato at The Academy in Greece


এতো জ্ঞানী মানুষ, যিনি প্লেটোর মতো শুধু "চিন্তা" না করে "বাইরে গিয়ে দেখা"-তে বিশ্বাস করতেন, অর্থাৎ গবেষণালব্ধ জ্ঞানে বিশ্বাস করতেন, তিনি তার জীবদ্দশায় (৩৮৪ - ৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) বলেছিলেন যে একটি উঁচু জায়গা থেকে যদি একটি ধাতব পদার্থের টুকরা এবং একটি কাঠের টুকরা একসঙ্গে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে যেটির ওজন বেশি সেটি আগে নিচে পড়বে।


গ্যালিলিও গ্যালিলেই পিসার হেলানো টাওয়ার থেকে কাঠের এবং লোহার বল ফেলে দিচ্ছেন, তাঁর ঐতিহাসিক মাধ্যাকর্ষণ পরীক্ষার সময়। Galileo Galilei dropping a wooden and an iron ball from the Leaning Tower of Pisa during his famous gravity experiment.


এরিস্টটলের মতো মহাজ্ঞানী মানুষ যখন বলছেন, তখন তো ঠিকই বলছেন, তাই না? 😀 তার কথাকে ভুল বলার সাহস কার! তারপর কেটে গেছে প্রায় দুই হাজার বছর! কেউ তার এই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেনি। ১৬ শতকে এসে, ইতালীয় পলিম্যাথ গ্যালিলিও পিসার হেলানো টাওয়ারে উঠে একটি কাঠের বল আর একটি লোহার বল ফেলে পরীক্ষা করলেন।

দেখা গেলো, দুটো আসলে একই সময়ে নিচে পড়েছে! 😃 প্রায় দুই হাজার বছর ধরে প্রচলিত একটি ভুলের অবসান হলো।


বায়াস অব অথরিটি: অন্ধ বিশ্বাসের মনোবিজ্ঞান

চিন্তা করুন, একটি সাধারণ পরীক্ষা! কিন্তু কেউ করল না! সবাই এরিস্টটলের কথাকে সত্য মেনে নিয়ে এক নয়, দুই নয়, ১৯টি শতাব্দীরও বেশি সময় পার করে দিল! এই যে প্রভাবশালী, সমাজে স্বীকৃত, সমাদৃত, এবং প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কথায় বাড়তি ওজন দেওয়া — সেলিব্রিটি মানুষদের কথাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া — এটিকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় "বায়াস অব অথরিটি।" অর্থাৎ, যাদের কোনো অথরিটি আছে, তাদের কথাকে একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, বিশ্বাস করা, বা বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া।


অথরিটির প্রতি আমাদের অন্ধ বিশ্বাসের উদাহরণ

যেমন এই লেখাটার কথাই ধরুন! আমি খালিদ হাসান জীবন, পেশায় একজন মামুলি ডিজাইনার, অল্পশিক্ষিত মানুষ। আমি যখন ডিজাইন বাদে সাইকোলজি নিয়ে কিছু বলি, সেটাকে আপনি যতটা বিশ্বাস করবেন বা গুরুত্ব দেবেন, তার চেয়ে একজন সাইকোলজির প্রফেসর, সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট, অথবা অন্তত সাইকোলজিতে ডিগ্রি আছে এমন কেউ এসে কিছু বললে সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন বা বিশ্বাস করবেন! এমনকি তারা যদি ভুল কিছুও বলে ফেলেন আর আমি সঠিক তথ্য এনে হাজির করি, তবুও তাদের কথার বিপরীতে আমারটা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। 😃

একইভাবে, একেবারে সাধারণ বিষয়গুলোতেও আমার মতামতের চেয়ে আমার চেয়ে বেশি ইনফ্লুয়েন্স এবং অথরিটি আছে এমন মানুষের কথাকেই আপনি বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন।


তাহলে উপায় কী?

এটি হচ্ছে মস্তিষ্কের জন্য একটি শর্টকাট। কেউ কোনো তথ্য দিলে, সেটি আলাদাভাবে যাচাই করা বা গুণাগুণ বিচার করতে যে পরিশ্রম লাগে, তা এড়ানোর কৌশল। কিন্তু এরিস্টটলের উদাহরণ থেকেই আমরা বুঝলাম এর ক্ষতিকর দিক আছে। তাহলে উপায় কী?

উপায় হলো তথ্যের গুণাগুণ বিচার করা, যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা, এবং কিছু ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করা। আমাদের মস্তিষ্ক শর্টকাট চায়, কিন্তু সেটি না দেওয়া।

তথ্যদাতা যেই হোক — এরিস্টটল, আইনস্টাইন, খালেদ মহিউদ্দীন বা মুন্নি সাহা — তাদের তথ্যের যৌক্তিকতা ও গুণাগুণ প্রশ্ন করাই এই বায়াস এড়ানোর প্রথম ধাপ।


বায়াস এড়ানো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই বায়াস এড়ানো কেন গুরুত্বপূর্ণ? এটি এড়াতে না পারলে, অথরিটি থাকা মানুষজন যা খুশি তাই বলে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা যা বলবে, আপনি বিনা প্রশ্নে মেনে নেবেন। এটি একজন ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরশাসক তৈরির অন্যতম ফ্যাক্টর। কারণ নেতা যা বলে, কর্মীরা তা-ই বিশ্বাস করে এবং মেনে নেয়। নেতার ইচ্ছা পূরণে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করে। নেতার কথার বিপরীতে কেউ কিছু বললে, সেটিও তারা বিশ্বাস করে না।


শেষ কথা

অনেক বড় হয়ে গেল! আরও অনেক কিছু বলার ছিল! 😃 তবে এখানেই আপাতত শেষ করা যাক। আবার কোনদিন বাকি কথাগুলো লেখা যাবে। যারা কৌতূহলী, তাদের জন্য দুটি গুগল সার্চ টার্ম রেখে যাচ্ছি:

  • Milgram Experiment (1961)

  • Cognitive Heuristics (Daniel Kahneman and Amos Tversky)

সমাপ্ত

লেখাটি ভালো লেগেছে?
অন্য কেউ জানলে উপকৃত হবে বলে মনে করেন? তাহলে শেয়ার করুন অন্যদের সাথে! 😊

এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমার ভাবনার জগৎ তৈরি হয়েছে। সমাজ, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস — এসব বিষয়ে জানার কৌতূহলই আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।

আমি খালিদ হাসান জীবন। পেশায় প্রোডাক্ট ডিজাইনার, কিন্তু আগ্রহের ক্ষেত্র তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও, আমার শেখার ক্ষুধা কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ডিজাইন থেকে দর্শন, প্রযুক্তি থেকে তত্ত্ব, সবকিছু নিয়েই ভাবতে ভালোবাসি।

আমি লিখি, যখন মনে হয় কোনো ভাবনা শুধু আমার মধ্যে আটকে না রেখে অন্যদের সাথেও ভাগ করা দরকার। যদি আমার লেখা কাউকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন তুলতে উদ্বুদ্ধ করে, কিংবা কোনো পুরোনো ধারণাকে একটু নাড়িয়ে দেয় — তাহলেই মনে হবে, লেখা সার্থক হয়েছে।

এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমার ভাবনার জগৎ তৈরি হয়েছে। সমাজ, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস — এসব বিষয়ে জানার কৌতূহলই আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।

আমি খালিদ হাসান জীবন। পেশায় প্রোডাক্ট ডিজাইনার, কিন্তু আগ্রহের ক্ষেত্র তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও, আমার শেখার ক্ষুধা কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ডিজাইন থেকে দর্শন, প্রযুক্তি থেকে তত্ত্ব, সবকিছু নিয়েই ভাবতে ভালোবাসি।

আমি লিখি, যখন মনে হয় কোনো ভাবনা শুধু আমার মধ্যে আটকে না রেখে অন্যদের সাথেও ভাগ করা দরকার। যদি আমার লেখা কাউকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন তুলতে উদ্বুদ্ধ করে, কিংবা কোনো পুরোনো ধারণাকে একটু নাড়িয়ে দেয় — তাহলেই মনে হবে, লেখা সার্থক হয়েছে।

এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমার ভাবনার জগৎ তৈরি হয়েছে। সমাজ, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস — এসব বিষয়ে জানার কৌতূহলই আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।

আমি খালিদ হাসান জীবন। পেশায় প্রোডাক্ট ডিজাইনার, কিন্তু আগ্রহের ক্ষেত্র তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও, আমার শেখার ক্ষুধা কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ডিজাইন থেকে দর্শন, প্রযুক্তি থেকে তত্ত্ব, সবকিছু নিয়েই ভাবতে ভালোবাসি।

আমি লিখি, যখন মনে হয় কোনো ভাবনা শুধু আমার মধ্যে আটকে না রেখে অন্যদের সাথেও ভাগ করা দরকার। যদি আমার লেখা কাউকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন তুলতে উদ্বুদ্ধ করে, কিংবা কোনো পুরোনো ধারণাকে একটু নাড়িয়ে দেয় — তাহলেই মনে হবে, লেখা সার্থক হয়েছে।

মনোজগত

নিয়ে আরও লেখা

Blog cover image

মনোজগত

২৭ ডিসে, ২০২৩

অন্যরা যেভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে: ফেইসবুক রিয়্যাক্ট থেকে শুরু করে গ্রুপ থিংকিং

অন্যরা আমাদের সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে? গ্রুপ থিঙ্কিং কী?

Blog cover image

মনোজগত

২৭ ডিসে, ২০২৩

অন্যরা যেভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে: ফেইসবুক রিয়্যাক্ট থেকে শুরু করে গ্রুপ থিংকিং

অন্যরা আমাদের সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে? গ্রুপ থিঙ্কিং কী?

Blog cover image

মনোজগত

২৭ ডিসে, ২০২৩

অন্যরা যেভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে: ফেইসবুক রিয়্যাক্ট থেকে শুরু করে গ্রুপ থিংকিং

অন্যরা আমাদের সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে? গ্রুপ থিঙ্কিং কী?

Blog cover image, স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

মনোজগত

২০ ডিসে, ২০২৩

স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

আপনি যা মনে করতে পারেন তা আসলে কতটুকু সত্যি? কেন কিছু কল্পিত ঘটনা সত্যি মনে হয়?

Blog cover image, স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

মনোজগত

২০ ডিসে, ২০২৩

স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

আপনি যা মনে করতে পারেন তা আসলে কতটুকু সত্যি? কেন কিছু কল্পিত ঘটনা সত্যি মনে হয়?

Blog cover image, স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

মনোজগত

২০ ডিসে, ২০২৩

স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি

আপনি যা মনে করতে পারেন তা আসলে কতটুকু সত্যি? কেন কিছু কল্পিত ঘটনা সত্যি মনে হয়?