স্মৃতির রহস্য: কেন আমরা ভুলে যাই এবং নতুন স্মৃতি তৈরি করি
আপনি যা মনে করতে পারেন তা আসলে কতটুকু সত্যি? কেন কিছু কল্পিত ঘটনা সত্যি মনে হয়?
মনোজগত
২০ ডিসে, ২০২৩
স্মৃতির ভুল এবং ফ্ল্যাশবাল্ব মেমোরি
এমন কি কখনো হয়েছে যে আপনার কাছের কেউ একজন অতীত একটা ঘটনার কথা আপনার সামনে কারও সাথে শেয়ার করছে, কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে– "ঘটনাটা তো এইভাবে ঘটেনি!" অথবা ঘটনার অনেক কিছুই আপনার স্মৃতির সাথে মিলে যাচ্ছে তবে কিছু কিছু জিনিস মনে হচ্ছে হয়তো আপনি ভুলে গেছেন, বা যে ঘটনাটা বলছে সে নিজেই ভুল বলছে?
মানুষের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। এখানে কেউ হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলছে না। আসলে মানুষ খুবই বেদনাদায়ক অথবা নাটকীয় ঘটনা সম্পর্কে ভুল স্মৃতি ধরে রাখে। আবার, মানুষের মস্তিষ্ক নতুন স্মৃতি তৈরিও করতে পারে! তার কাছে মনে হয় তার জীবনে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা বা ঘটনার কিছু অংশ একেবারে সত্যি, কিন্তু সেগুলো আসলে সত্যি না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলে ফ্ল্যাশবাল্ব মেমোরি।

মস্তিষ্কের ভূমিকা: হিপোক্যাম্পাস এবং অ্যামিগডালা
মানুষের মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস নামে একটা জায়গা আছে, যেখানে তার সব স্থায়ী স্মৃতি থাকে; অর্থাৎ আপনার অনেক বছর মনে থাকে এমন স্মৃতিগুলো। আর মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মস্তিষ্কের আরেকটি ছোট অংশ, যার নাম– অ্যামিগডালা; এবং এর নেটওয়ার্ক– লিম্বিক সিস্টেম। অর্থাৎ, ভূমিকম্প হলে আপনি দৌড়ে যে নিরাপদ স্থানে যেতে চান, সাপ দেখলে যে আপনি ভয় পেয়ে যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে বাঁচাতে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান, বা সাপটাকে মেরে ফেলেন, এগুলোই আসলে এই অ্যামিগডালা তথা লিম্বিক সিস্টেম এর কাজ। ফ্ল্যাশবাল্ব মেমোরি প্রক্রিয়াকরণ করে অ্যামিগডালা, যা হিপোক্যাম্পাসের খুব কাছে অবস্থিত। তাই অতীতের কোন ট্রমাটিক বা ড্রামাটিক ঘটনার সবকিছু সত্য না হলেও আমাদের কাছে মনে হয় খুব স্পষ্ট সত্য!
স্মৃতি তৈরি এবং পরিবর্তনের প্রক্রিয়া
আর মানুষের মস্তিষ্ক স্মৃতি তৈরি করে কীভাবে?
৫ বছর আগের কোন একটা ঘটনা মনে করার চেষ্টা করে দেখুন, হয়তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, অথবা পরিবারের সবাই একত্রিত হওয়ার কোন একটা ঘটনা। সেখানে কে কে ছিলো? হয়তো এমন কারও কথা আপনার মনে হবে, যে সেখানে আসলে ছিলো না। তবে কেন আপনার মনে হচ্ছে যে সে সেই আড্ডায় ছিলো?
মানুষের স্মৃতি আসলে পরিবর্তিত হয়। যতবার আমরা একটা স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করি, ততবার আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিটা নতুনভাবে তৈরি করে। আর এই নতুনভাবে তৈরি করার সময় কোন ছোট একটা অংশ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে! এজন্য, নিজের চোখে দেখা ঘটনাও যে সবসময় সত্যি হবে, বিশেষ করে পুরনো কোন ঘটনা, বিষয়টা তা না। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে ভুল তথ্য দিতে পারে।
এলিজাবেথ লফটাসের গবেষণা: প্রশ্নের মাধ্যমে স্মৃতিকে প্রভাবিত করা
১৯৭৪ সালে, অ্যামেরিকান মনোবিজ্ঞানী এলিজাবেথ লফটাস একটা গবেষণা করেছিলেন (Loftus & Palmer, 1974)। তিনি প্রথমে একটা কার দুর্ঘটনার ভিডিও ক্লিপ কিছু মানুষকে দেখিয়েছেন। তারপর তাদেরকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছেন। তবে প্রশ্ন করার সময় তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ন শব্দ একটু এদিক সেদিক করে দিয়েছেন। যেমন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন–
অন্য গাড়িটাকে "চুরমার" করে দেওয়ার আগে কার-টা কতো গতিতে যাচ্ছিলো বলে আপনার মনে হয়?
অন্য গাড়িটাকে "আঘাত" করার আগে কার-টা কতো গতিতে যাচ্ছিলো বলে আপনার মনে হয়?
আপনি কি কোন ভাঙা কাঁচ চেখতে পেয়েছেন?
যখন প্রশ্নের মধ্যে "আঘাত" এর বদলে "চুরমার" ব্যবহার করা হয়েছে, তখন উত্তরদাতারা গাড়ির গতি বেশি বলেছেন। অর্থাৎ প্রশ্নে "আঘাত" শব্দটা ব্যবহার করার সময় যে গতি বলেছিলেন, তার থেকে বেশি। আবার "চুরমার" শব্দটা ব্যবহার করার ফলে তারা যতগুলো ভাঙা কাঁচ দেখার কথা বলেছেন, সেটা "আঘাত" শব্দটা ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তরের দ্বিগুণ ছিলো!
তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো? প্রশ্নে চিন্তা ভাবনা করে শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমেই উত্তরদাতার উত্তরকে প্রভাবিত করা যেতে পারে!
এই তথ্যগুলো কোথায় জেনেছি?
এই চমৎকার তথ্যগুলো প্রথমে পেয়েছি Dr. Susan M. Weinschenk এর বই 100 Things Every Designer Should Know About People এর মধ্যে। তারপর প্রতিটা টপিকে একটু আলাদাভাবে ঘাটাঘাটি করেছি ইন্টারনেটে।
চমৎকার একটা বই, পড়ে ফেলতে পারেন।
